বদর দিবসের শিক্ষা

ইতিহাস ইসলাম গাইড

উস্তাজ আমীন ইলদিরিম (তুরস্কের প্রখ্যাত সিরাত বিশেষজ্ঞ)

কোরআন নাযিলের মাস মাহে রমযান আমাদেরকে অনেক কিছুর জন্যই প্রতি বছর আমাদের মাঝে আগমন করে থাকে, তবে যা কিছুর জন্য এসে থাকে এর মধ্যে অন্যতম হল আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য এসে থাকে। মানুষের স্বভাবই হল ভুলে যাওয়া তাই মহান আল্লাহও আমাদের প্রতি রহম করে বিভিন্ন ওসিলায় আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে থাকেন। এই জন্য আমরা যদি মাসে কিছু কিছু বিষয়কে স্মরণ করতে পারি এবং ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারি তাহলে এই মাসকে আমরা সঠিক ভাবে পালন করার পন্থাও খুঁজে পাব।
রমযান আমাদেরকে কি স্মরণ করিয়ে দেয়? অনেক বিষয়ই রমযান আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে থাকে। যেমন, সময় নামক যে একটি নিয়ামত মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে দিয়েছেন এই বিষয়টি আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে থাকে। রমযানের প্রতিটি মুহূর্তই আমাদের জন্য বরকত ও রহমত স্বরূপ। পবিত্র রমযান মাসে আমরা যে পরিমাণে আমাদের ঘড়ি দেখে থাকি অন্য কোন সময়ই আমরা তা করি না। কিন্তু আমরা যদি এই শিক্ষাকে আমাদের অন্য সময় সমূহতেও কাজে লাগাতে পারতাম তাহলে আমাদের জীবনটাই পাল্টে যেত।

আজ ঐতিহাসিক বদর দিবস। বদরের ঐ দিন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সমগ্র দুনিয়ার মুসলমানগণ বদরের রূহকে নিজেদেরকে মধ্যে জাগরুক রাখার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে।

এটা মূলত আমাদের প্রতি সাহাবীদের একটি উপদেশ। প্রখ্যাত সাহাবী সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস বলেন, ‘আমরা কোরআনের একটি সূরাকে বুঝার জন্য যেভাবে প্রচেষ্টা চালাতাম, আল্লাহর রাসূল (সঃ) এর একটি গাযওয়াকেও বুঝার জন্যও আমরা একই রকম প্রচেষ্টা চালাতাম’।

কোরআনের একটি সূরাকে বুঝার জন্য সাহাবীদের মধ্যে যে আন্তরিকতা ছিল রাসূল (সঃ) যুদ্ধ ও গাজওয়া সমুহকেও বুঝার জন্য অর্থাৎ রাসূল (সঃ) এর সিরাতকেও বুঝার জন্য তাদের মধ্যে ঐ একই ধরণের আন্তরিকতা ছিল।

এর পেছনে কারণ কি ছিল? এর কারণ হল, রাসূল (সঃ) এর জীবনের বড় একটি অংশ এই গাজওয়া সমূহের সাথে সম্পৃক্ত। এই সকল গাজওয়ার মূল বার্তা সমূহ ছিল মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে।

বদর যুদ্ধকে ভালো ভাবে বুঝার অর্থ হল, সূরা আনফালকে ভালোভাবে পড়া ও বুঝা।

উহুদ যুদ্ধকে ভালোভাবে পড়া ও বুঝার অর্থ হল, সূরা আলে ইমরানকে ভালোভাবে পড়া ও বুঝা।

খন্দকের যুদ্ধকে ভালোভাবে পড়া ও বুঝার অর্থ হল, সূরা আহযাবকে ভালোভাবে পড়া ও বুঝা।

হুদায়বিয়া ও মক্কা বিজয়কে ভালোভাবে পড়া ও বুঝার অর্থ হল, সূরা আল-ফাতহকে ভালোভাবে পড়া ও বুঝা।

তাবুক ও হুনাইনকে ভালোভাবে পড়া ও বুঝার অর্থ হল, সূরা তাওবাকে ভালোভাবে পড়া ও বুঝা।

এই জন্য আমরা যখন এই সকল যুদ্ধকে ভালোভাবে পড়ি তখন মূলত রাসূল (সঃ) এর জীবন কিভাবে জীবন্ত কোরআনে পরিণত হয়েছিল সেটা বুঝে থাকি। সাহাবীগণ এই বিষয়টি ভালোভাবে উপলব্ধি করার কারণে কোরআনকে যেভাবে বুঝার চেষ্টা করতেন আল্লাহর রাসূল (সঃ) এর জীবনকেও বুঝার জন্য সেভাবে প্রচেষ্টা চালাতেন।

সাহাবীদের মত সমগ্র বিশ্বের মুসলমানরাও ১৪০০ বছরের বেশী সময় ধরে রাসূল (সঃ) এই সকল যুদ্ধ ও গাজওয়াকে বুঝার জন্য নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে আমরা কেন জানি এই সকল বিষয়ে একটি কম গুরুত্ত্ব দিচ্ছি, বদরকে আমাদের অন্তরে জাগরুক করে রাখার জন্য বদর দিবসকে ভালো ভাবে পালন করা ও এই দিবস উপলক্ষে সেমিনার ও সভার আয়োজন করা।

আজকে আমি আমার এই আলোচনায় বদরের পাঁচটি তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করব,

১। বদর হল; গোমরাহী ও হেদায়েতের মধ্যে, ঈমান ও কুফরের মধ্যে, ইখলাসের সাথে নিফাকের মধ্যে গভীরভাবে পার্থক্যকারী একটি যুদ্ধের নাম।
এর দলীল কি? এর দলীল হল মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে ৪১ নম্বর আয়াত। মহাগ্রন্থ আল-কোরআন বদরকে ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ ( يَوْمَ الْفُرْقَانِ ) বলে অভিহিত করেছে। ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ ( يَوْمَ الْفُرْقَانِ ) কি? ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ ( يَوْمَ الْفُرْقَانِ ) হল, পার্থক্য করার, ফয়সালা করার দিন। কিসের মধ্যে পার্থক্য করেছে? ঐদিন পর্যন্ত কি ঈমান ও কুফরীর মধ্যে পার্থক্য রচিত হয়নি? যারা ঈমান এনেছিল তারাতো মদিনাতে হিজরত করে চলেই এসেছিল। তাহলে কোরআন কেন এই দিনকে এমন একটি নামে নামকরণ করলো? এখানে যে বিষয়টির কারণে কোরআন ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ ( يَوْمَ الْفُرْقَانِ ) বলেছে তা হল, যারা ঈমান এনেছিল তাদের দিক থেকে হক্ব ও বাতিল, ঈমান ও কুফরীর ব্যপারে কোন সন্দেহ ছিল না। সন্দেহ ছিল না বলেই তারা ইসলাম গ্রহণ করার শুরুর দিন থেকেই অনেক ত্যাগ কোরবানী দিয়ে আসছিলেন। সন্দেহ ছিল কাফির ও মুশরিকদের দলে। তারা তখনও ভাবত যে, যারা তাদের বাপ-দাদার ধর্ম ছেঁড়ে চলে গেছে তারা একদিন নিজেদের ভুল বুঝে পুনরায় ফিরে আসবে কিন্তু বদরের পরে তাদের এই আশায় গুড়েবালি পড়ে। বদরের পর মুশরিকরা এই কথা স্বীকার করে নেয় যে, এরা আর কোন দিন ফিরে আসবে না। মুহাজির সাহাবীগণ তাদেরকে এই যুদ্ধে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের এই সংগ্রাম দুনিয়াবি কোন স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নয়, সাময়িক চটকদার কোন কিছুর জন্য নয়। তাদের এই সংগ্রাম হল দুনিয়ার বুকে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

২। বদর হল, গনীমত ও আসাবিয়াত (জাতীয়তাবাদ, গোত্রপ্রীতি) বিরুদ্ধে তাওহীদ ও আকাঈদের সংগ্রামের নাম।
মরক্কোর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মাদ আবিদ আল জাবিরী বলেন, বিশ্বমানবতা আজ পর্যন্ত যত যুদ্ধ করেছে এর মূল কারণ ছিল তিনটি, যুদ্ধের পেছনে হয়ত আকীদাগত দ্বন্দ ছিল, না হয় গণিমতগত স্বার্থ ছিল আর না হয় আসাবিয়াত বা গোত্রপ্রীতি (জাতীয়তাবাদ, জাতীয় স্বার্থ)। এই তিনটির বাহিরে আর অন্য কোন কারণে কোন যুদ্ধ হয়নি।
বদরের ময়দানে সেই বীর সাহাবীগণ কেন এসেছিলেন? তারা এসেছিলেন ঈমান ও তাওহীদের চিন্তাকে দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, সকল মানুষের কাছে ইসলামের আকীদাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
মক্কার মুশরিকরা কেন এসেছিল? তাদের এক অংশ এসেছিল গনিমতের জন্য, অপর অংশ এসেছিল আসাবিয়াত বা গোত্রপ্রীতির কারণে।

৩। বদর হল, যারা বেঁচে থাকার জন্য বেঁচে থাকে তাদের জন্য নয় বরং যারা বাঁচিয়ে রাখার জন্য বেঁচে থাকে তাদের যুদ্ধ ছিল এই বদর।
এটা কি? এটা হল, নবীদেরক একটি আখলাকের নাম। সবাই এই কাজ করতে পারে না। হয়ত নিজের সন্তানের জন্য কিংবা নিজের ভবিষ্যতের জন্য পরিশ্রম করতে পারেন কিন্তু এটা হল বেঁচে থাকা, এর নাম বাঁচিয়ে রাখা নয়।
আর অন্যটি হল বাঁচিয়ে রাখা। এই কথা বলতে শেখা, ‘ দরকার হলে আমি নিজেকে উৎসর্গ করব তবুও আমাদের উম্মাহ যেন বেঁচে থাকে, আমি না খেয়ে থাকব কিন্তু আমার ভাই যেন খেতে পারে, আমার পরে যারা আসবে তারা যেন সুখে থাকে এই জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে দিব’।
আমরা মুসলমানরা এটাকে ইছার বলে থাকি। যার অর্থ হল, বেঁচে থাকার জন্য বেঁচে থাকা নয়, বাঁচিয়ে রাখার জন্য বেঁচে থাকা।
বদরের যুদ্ধে সাহাবায়ে কেরামের ভূমিকাকে ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলেই আমরা এর প্রমান পাই।

৪। বদর হল; ইসলামের জন্য, উম্মাহর জন্য কি করা সম্ভব এটা প্রমান করে দেওয়ার নাম। সমগ্র উম্মাহ ১৫০০ বছর যাবত যা করছে সেটা তো বদরের সেই ৩১৩ জন মহান সাহাবীর ত্যাগের বদৌলতেই। তাদের কাছে খুব বেশী কিছু ছিল না, ৩১৩ জনের জন্য মাত্র ১০০ র মত সাওয়ারী ছিল, নবী করীম (সঃ) সহ তিনজনের ভাগে একটি করে সাওয়ারি ছিল। মরু প্রান্তরে ৩ জন পালাক্রমে একটি সওয়ারীর পীঠে উঠেছেন। কোন তিনজন কোন সওয়ারীর পীঠে উঠবে এটা রাসূল (সঃ) বলে দেন এবং হযরত আলী (রাঃ), হযরত মারসাদ (রাঃ) ও রাসূল (সঃ) একটি সাওয়ারী নেন। হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত মারসাদ পরামর্শ করেন যে, তারা সওয়ারীর পীঠে উঠবেন না। যাতে করে রাসূল (সঃ) না হাটতে হয়। তারা এই প্রস্তাব নিয়ে রাসূল (সঃ) এর কাছে গেলে রাসূল (সঃ) জবাবে তাদেরকে বলেন, কেন? আমার চেয়ে তোমাদের কি বেশী আছে? তোমরা যদি আল্লাহর পথে তোমাদের পাকে ধুলামলিন করে সাওয়াব অর্জন করতে চাও তাহলে আমিও তো আল্লাহর পথে নিজের পা কে ধুলামলিন করতে চাই। তাদের জোর করার পরেও তিনি তাদের সাথে পালা ক্রমে একই সাওয়ারীতে উঠেন।
কাফেরদের দুইশত ঘোড়া ছিল আর মুসলমানদের ছিল মাত্র দুইটি। একটি ছিল জুবাইর ইবনুল আওয়াম (রাঃ) এর কাছে আর অপরটি ছিল মিকদাদ বিন আমর (রাঃ) এর কাছে। রাসূল (সঃ) মুশরিকদের দুইশত অশ্বারোহীকে দুই জন দিয়ে মোকাবেলা করার জন্য একজনকে সেনাবাহিনীর ডান পাশে আর অপরজনকে বাম পাশে নিয়োজিত করেন।
কিন্তু তাদের এই সংগ্রাম ছিল রিসালাত-ই মুহামদ্দীর জন্য, তাদের এই সংগ্রাম ছিল ইসলামের জন্য। তাই জুবাইর ইবনুল আওয়াম ও মিকদাদ বিন আমর (রাঃ) বিন্দু মাত্র চিন্তা না করে রাসূল (সাঃ) কতৃক প্রদত্ত্ব দায়িত্বকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন।
যদি তারা হিসাব-কিতাব করতেন তাহলে এই ঝুঁকি নিতে পারতেন না। প্রিয় ভাইয়েরা হিসাব কিতাব করে এই সংগ্রামে টিকে থাকা যায় না। যদি হিসাবই করতেন তাহলে মুসা (আঃ) তার লাঠি দিয়ে লৌহিত সাগরকে ১২ ভাগে ভাগ করতে পারতেন না, যদি হিসাবই করতেন তাহলে ইব্রাহীম (আঃ) নমরুদের অগ্নিকুণ্ডে ঝাপ দিতেন না, যদি হিসাবই করতেন তাহলে হযরত ইসমাইল (আঃ) তার সেই ছোট্ট গলাটিকে তার পিতার ছুঁড়ির নীচে দিয়ে বলতেন না, বাবা কাটো, তুমি কি আল্লাহর আদেশ অমান্য করবে? যদি হিসাব করতেন তাহলে রাসূলে আকরাম (সঃ) তায়েফের পর আর এক পাও সামনে অগ্রসর হতে পারতেন না।
আল্লাহর এই দ্বীনের পথের সংগ্রাম এত হিসাব কিতাব করে হয় না। তাহলে কি দিয়ে হয়? মানুষ হিসেবে নিজের সর্বোচ্চটুকু ঢেলে দিয়ে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করার মাধ্যমেই হতে পারে।

৫। বদরের যুদ্ধ ছিল, হয় টিকে থাকার না হয় ধ্বংস হয়ে যাওয়ার যুদ্ধ। যুদ্ধে অবতীর্ণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আগে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) দোয়া করেন-

‘হে আল্লাহ! ক্ষুদ্র এ দলটি যদি আজ শেষ হয়ে যায়, তবে কিয়ামত পর্যন্ত তোমার নাম নেওয়ার মতো কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না।’ রাসুল (সা.)-এর এই দোয়া থেকেই স্পষ্ট হয়, বদর যুদ্ধের প্রেক্ষাপট কী ভয়াবহ ছিল। মহান আল্লাহ দয়া করে সেদিন ফেরেশতাদের দ্বারা মুমিনদের সাহায্য করেছিলেন।

এখন একটি প্রশ্ন, বদর কি শেষ হয়ে গিয়েছে? বদর সমূহ কোনদিনই শেষ হবে না। আবু লাহাব ও আবু জেহেলরা যতদিন এই দুনিয়াতে থাকবে ততদিন বদরও থাকবে। আবু লাহাব ও আবু জেহেলরা যেহেতু শেষ হবে না, সেহেতু বদর সমূহও শেষ হবে না। তাই আসুন বদরের সাহাবীদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে ইসলামী সভ্যতাকে পুনরায় বিজয়ী সভ্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাই।

অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।