কঠিন সময়ের শিক্ষা ও ইবাদত

প্রবন্ধ

প্রফেসর ডঃ মেহমেদ গরমেজ 

আমরা আজ যে কঠিন সময় পার করছি এই সময়ে আমাদের আজকের এই চতুর্থ ক্লাসে আমাদের ইবাদতের জিন্দেগী নিয়ে আলোচনা করতে চাই। আপনারা জানেন এক সপ্তাহ পরেও রমজান মোবারক আসছে। আমরা যে মুসাফিরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি সেই মুসাফির আমাদের মাঝে আগমন করবে। ইনশাল্লাহ এই বছরও এই পবিত্র রমজান আমাদের জন্য নিয়ামতের ফাল্গুধারা এবং রহমত বইয়ে আনবে। কিন্তু এই বছর মাহে রমজান ভিন্ন একটি দুনিয়ার সাক্ষাৎ পাবে। দুনিয়ার সকল মসজিদ সমূহ বন্ধ পাবে। উৎসব মুখর পরিবেশে আদায়কৃত শুধুমাত্র তারাবিহ নামাজ সমূহই নয়, ওয়াক্ত নামাজ সমূহও মসজিদে গিয়ে জামায়াতের সাথে আদায় করতে পারব না। আমাদের সাপ্তাহিক ঈদ এবং ইসলামের বড় একটি শায়া’য়ির জুমু’য়া নামাজ সমূহকে আদায় করতে পারব না। কা’বাতুল্লাহ বন্ধ। যেমনটা প্রতি বছরই হয়ে থাকে তেমনি ভাবে এই বছর আমাদের কেউ তাদের অন্তরের প্রশান্তির জন্য উমরাহ করতে যেতে পারবে না এবং তাওয়াফ করতে পারবে না। এই বছর হজ্জ বাতিল করা হয়েছে। হয়তবা এই বছর কেউ আরাফাতে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আরাফাতে অবস্থান করবে না। এই অবস্থা শুধুমাত্র আমাদের জন্য নয়, সমগ্র দুনিয়ার অবস্থা আজ একই রকম। একজন মুসলিম হিসেবে এটা যে আমাদের জন্য কত দুঃখের এবং উদ্বিগ্নের তা নিজের জীবন থেকে অনুভব করছি। কিন্তু কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইবাদতের পন্থা, ইসলামের বিশ্বজনীন ইবাদতের মূলনীতি সমূহ এবং ইসলামের মসজিদ ও ইবাদতগাহের ব্যাপারে যে দৃষ্টিভঙ্গী সেটাকে সামনে রেখে যখন চিন্তা করি তখন মানসিকভাবে প্রশান্তি পাই। 

প্রিয় ভাইয়েরা, 
আজকে আমাদের এই আলোচনায় এই সকল বিশ্বজনীন মূলনীতি আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই। 

প্রথমতঃ আমরা বিশ্বাস করি যে সমগ্র দুনিয়াই আমাদের জন্য মসজিদ। রাসূলে আকরাম (সঃ) বলেছেন, جُعِلَتْ لِىَ الأَرْضُ مَسْجِدًا , 
অর্থঃ পৃথিবীকে আমাদের জন্য মসজিদ বানানো হয়েছে। (বুখারী, কিতাবুস সালাত-৫৬)।
এই বিষয়টি যেন আমরা ভূলে না যাই। 

দ্বিতীয়তঃ আমাদের ইবাদত সমূহের মধ্যে কোন ধরণের ওসিলার (মাধ্যম) প্রয়োজন নেই। আমাদের নামাজ, তসবিহ, তিলাওয়াত ও জিকিরের জন্য কোন ধরণের ওসিলার দরকার নেই। আজ পৃথিবীতে যত ধর্ম রয়েছে তার মধ্যে আমাদের দ্বীন ইসলামই কেবলমাত্র এই বিশেষত্বের অধিকারী। যেই দ্বীনে ইবাদত সমূহ কবুল হওয়ার জন্য কোন ধরণের ওসিলার প্রয়োজন নেই।

তৃতীয়তঃ আমাদের ইবাদতের ধারণা শুধুমাত্র জানা ইবাদত সমূহ কিংবা আমাদের ফিকহের গ্রন্থ সমূহে ইবাদাতে মারসুমা বা আনুষ্ঠানিক ইবাদত যেমন, নামাজ, রোজা, হজ্জ এবং উমরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। 

চতুর্থতঃ আমাদের ইবাদতগাহ সম্পর্কে ভিন্ন একটি চিন্তা রয়েছে। সেটি হল, আমাদের ইবাদতগাহ সমূহ ইবাদতের জন্য কোন পূর্ব শর্ত নয়। অন্যান্য ধর্মের পূজারস্থান সমূহের মত আমাদের ইবাদতগাহ সমূহ মূর্তি কিংবা ছবিতে পূর্ণ কোন স্থান নয়। আমাদের ইবাদতগাহ সমূহ রূহসমূহকে, অন্তর সমূহকে একত্রিতকারী জায়গা, তাওহীদের একটি স্থান। 

পঞ্চমতঃ কঠিন সময়ে কিংবা প্রয়োজনে আমরা কিভাবে ইবাদত করব সেই বিষয় সমূহকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনাকারী আমাদের বিশ্বজনীন একটি ইবাদতের ফিকহ রয়েছে এবং ফিকহের একটি উসূল ও মেথডোলজি রয়েছে। 

প্রিয় ভাইয়েরা, 
এই সকল মূলনীতি সমূহের উপর ভিত্তি করে আমি বলতে চাই যে, মসজিদ সমূহ বন্ধ থাকা, জুমুয়া’র নামাজ আদায় করতে না পারা, হজ্জ এবং উমরা করতে না পারা আমাদের রবের প্রতি আমাদের যে ইবাদতের দায়িত্ব রয়েছে সেই দায়িত্ব থেকে বিরত রাখবে না। আমাদের সকল অবস্থাকেই আমরা আরও অনেক বড় একটি ইবাদত ও রহমতে রূপান্তরিত করতে পারি। 

নামাজ অবশ্যই দ্বীনের মূল স্তম্ভ। এর মাধ্যমে মানুষ তার রবের সাথে দিনে পাঁচবার সাক্ষাৎ করে থাকে। বিশেষ করে যুবক ভাইয়েরা যেন আমাদের রবের সাথে দিনে পাঁচবার সাক্ষাৎ করা থেকে মাহরুম না হয়। কিন্তু আমাদের ইবাদত সমূহ কেবলমাত্র নামাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের ইবাদতের ধারণায় আমাদের সমগ্র জীবনটাই ইবাদত। আমাদের জীবন, আমাদের প্রজন্ম, আমাদের সন্তান-সন্ততি এবং সমাজকে রক্ষা করার জন্য আমাদের ঘরে অবস্থানকে ইবাদতে রূপান্তরিত করতে পারি। এই সামর্থ্য আমাদের রয়েছে। 

সকল ধরণের আমলে সালেহই ইবাদত। সকল ধরণের ভালো কাজ ইবাদত। জ্ঞান অর্জন করা ও প্রচার করা ইবাদত। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া ইবাদত। মানুষকে সাহায্য করা ও তাদেরকে সু-সংবাদ দেওয়া ইবাদত। সকল ধরণের খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকা, অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা ইবাদত। মা লা ইয়া’নিয়ি (مالا يعنيه) তথা সকল প্রকার অপ্রাসঙ্গিক বিষয়কে পরিত্যাগ করা, নিরর্থক, ফায়দাবিহীন এবং উদ্দেশ্য বিহীন কাজ সমূহ থেকে দূরে থাকা ইবাদত। যে সকল বিষয় মানুষকে কষ্ট দেয় সে সকল বিষয়কে দূর করে দেওয়া ইবাদত। রাসূল (সঃ) ঈমানের পরিচয় পেশ করার সময় এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। মানুষের অভাব দূর করে দেওয়া, মানুষের কল্যাণের জন্য ব্যায় করা ইবাদত। ধৈর্য ধারণ করা এবং তাকদিরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা ইবাদত। যে কোন মানুষের সাথে হাসি মুখে কথা বলা, উত্তম কথা বলা ইবাদত। ইবাদতের ব্যপারে ইসলামের অনেক বিস্তৃত একটি ধারণা রয়েছে। তবে হ্যাঁ মৌলিক ইবাদত সমূহকে বাদ দিয়ে নয়। 

মসজিদে জামায়াতের সাথে নামাজ আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। কিন্তু আমাদের জীবন রক্ষা করা ফরজ। জেনেশুনে অন্যের রোগাক্রান্ত হওয়ার জন্য কারণ হওয়া হারাম। ফলশ্রুতিতে একটি সুন্নতকে পালন করতে গিয়ে অবশ্যই আমরা ফরজকে পরিত্যাগ করতে পারি না। সুন্নতকে পালন করতে গিয়ে আমরা যেন হারাম কাজ না করি। এই ওসিলায় আমরা আমাদের ঘরকে ইবাদতগাহে পরিণত করতে পারি। 

জুমুয়া’র নামাজ অবশ্যই অনেক গুরুত্বপূর্ণ, সামাজিক একটি ইবাদত এবং ইসলামের অনেক বড় একটি শিয়া’র (নিশানা)। কিন্তু এখানে মূল বিষয় হল সময়। নামাজ এখানে মূল বিষয় নয়। অর্থাৎ জুমুয়ার দিন। দুই রাকায়াত জুমুয়া’র নামাজ যোহরের নামাজের পরিবর্তে বা পরিপূরক হিসেবে ফরজ করা হয়েছে। যখন এই পরিপূরক বা পরিবর্তিত বিষয়টিকে আদায় করতে না পারবে তখন মূলে ফিরে যাবে এবং যোহরের নামাজ আদায় করবে। আমাদের ফিকহ এটাকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। 

যে সকল ভাইয়েরা উমরা করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন কিন্তু যেতে পারছেন না তারা উমরার জন্য জমাকৃত টাকাকে এই কঠিন সময়ে গরীব, দুঃখী ও অভাবীদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়ে আল্লাহর কাছ থেকে পুরষ্কার পেতে পারেন। কাবার চতুর্দিকে যে তাওয়াফ করতেন সেই তাওয়াফ তারা আল্লাহর গরীব-দুঃখী বান্দা, এতিম ও মিসকিনদের অন্তরের চতুর্দিকে করতে পারেন। তবে হা যখন কাবা খোলা থাকবে এবং যেতে কোন বাঁধা থাকবে না তখন এগুলো একটি অপরটির অলটারনেটিভ নয়। কেউ আবার আমার কথাকে ভূল বুঝবেন না। কিন্তু এখন যেহেতু রাস্তা ও কাবা উভয় বন্ধ তাই এই সকল বিষয়কে অনায়াসেই বেঁছে নেওয়া যেতে পারে। রাসূলে আকরাম (সঃ) একদিন কাবা ঘর তাওয়াফ করার সময় কাবাকে উদ্দেশ্য করে বলতেছিলেন, ما أَطْيَبَكِ , তুমি কতই না সুন্দর, ما أَطْيَبَ رِيحَكِ , তোমার গন্ধ কতই না পবিত্র, ما أعظمَكَ , তুমি কতই না মহান, ما أَعْظَمَ حُرْمَتَكِ তোমার সম্মান কতই না সু-উচ্চে, والذي نَفْسُ محمدٍ بيدِهِ لَحُرْمَةُ المُؤْمِنِ أعظمُ عِنْدِ اللهِ حُرْمَةً مِنْكِ , সেই সত্ত্বার শপথ যার হাতে মুহাম্মদের প্রান, নিঃসন্দেহে একজন মু’মিনের সম্মান আল্লাহর কাছে তোমার সম্মানের চেয়ে বেশী, অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, একজন মু’মিনের কালব তোমার চেয়ে অনেক বেশী মহান। ( ইবনে মাজা, ফিতান-২, আলবানী, সাহিহুত- তারগিব, ২৪৪১)। রাসূল (সঃ) কাবাকে উদ্দেশ্য করে এমন কথা বলেছেন। আমি মনে করি, এই বছর আমাদের ঐ সকল ঝাঁকঝমক পূর্ণ ইফতার মাহফিল সমূহ একটি সুযোগে পরিণত হবে। আমাদের খাবার টেবিলের ঐ সকল বাহারি ইফতার সমূহের টাকা সমূহ যদি আমরা গরীব দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দেই তাহলে তা আমাদেরকে তাদের দস্তরখানায় আমাদেরকে আরও ভালোভাবে প্রতিনিধিত্ব করবে। 

প্রিয় ভাইয়েরা, 
এখন আমি উসূলের দৃষ্টি কোন থেকে আমাদের বর্তমান অবস্থাকে সংক্ষিপ্ত ভাবে তুলে ধরতে চাই। ইসলামের সকল হুকুম সমূহকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। 

জারুরিয়্যাত; যা না হলেই নয়, খুবই জরুরী। এমন জরুরী হুকুম যা কোন ক্রমেই বাদ দেওয়া যাবে না। 

হাজিয়্যাত; জীবনকে সহজকারী বিষয় সমূহ। 

তাহসিনিয়্যাত; হল প্রতিটি কাজের সৌন্দর্য। বিশেষ করে সৌন্দর্য ও রুচিশীলতা। 

জারুরিয়্যাত; যা না হলেই নয়, খুবই জরুরী। না হলেই নয় এই মূলনীতির আওতায় পাঁচটি মৌলিক বিষয় রয়েছে, এগুলো যেন আমরা কক্ষনোই ভূলে না যাই। যেগুলো হলঃ জান, মাল, আকল, নাসল (বংশ) এবং দ্বীনকে রক্ষা করা। তবে, মাল, আকল, নাসল এবং দ্বীনের রক্ষা সব সময় জান রক্ষার পরে আসে। কারণ দ্বীন সহ সকল মুকাল্লিফিয়্যাত (দায়িত্ব) মানুষের জীবন রক্ষার সাথে সম্পৃক্ত। যেমন মানুষ মহাপ্রলয় (কিয়ামত) পর্যন্ত নিজেদের জীবনকে রক্ষা করতে পারে। 

এর আলোকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার মহা-গ্রন্থ আল-কোরআনে সুস্পষ্ট ভাবে মূলনীতি সমূহ পেশ করেছেন। সেই মূলনীতি সমূহ হল, 
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدّ۪ينِ مِنْ حَرَجٍۜ
অর্থঃ দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো কঠিন বিষয় আরোপ করেননি, তিনি তোমাদের কাছ থেকে কঠিন কোন কিছু চান না। (সূরা হজ্জ-৭৮) 
يُر۪يدُ اللّٰهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُر۪يدُ بِكُمُ الْعُسْرَ
অর্থঃ আল্লাহ তোমাদের সাথে নরম নীতি অবলম্বন করতে চান, কঠোর নীতি অবলম্বন করতে চান না ৷ (সূরা বাকারা-১৮৫)

لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْساً اِلَّا وُسْعَهَاۜ 
অর্থঃ আল্লাহ কারোর ওপর তার সামর্থের অতিরিক্ত দায়িত্বের বোঝা চাপান না ৷ (সূরা বাকারা-২৮৬)

রাসূলে আকরাম (সঃ) বলেছেন, 
إِنَّ الدِّينَ يُسْرٌ 
নিঃসন্দেহে, দ্বীন হল সহজ বিষয়। (বুখারী, কিতাবুল ঈমান-২৯)

প্রিয় ভাইয়েরা, 
এই সকল ব্যক্তিগত ইবাদতের সাথে সাথে এই কঠিন সময়ে আমাদেরকে নিয়ে এবং সমগ্র মানবতাকে নিয়ে চিন্তার করার একটি সময়। আমাদের এই সকল ইবাদত সমূহ তাফাক্কুরে রূপান্তরিত করতে পারি। 

পবিত্র কোরআনে ‘ইবরেত’ নামে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিভাষা রয়েছে। নয় জায়গায় উল্লেখিত ‘ইবরেত’ শুধুমাত্র একটি শব্দ নয়, আমার মতে শুধু একটি পরিভাষাও নয়। আমি মনে করি এটি একটি বুঝার পন্থা (Method of Understanding)। বুঝা এবং বিশ্লেষণের উসূল। বিশ্ব মানবতা হিসেবে যে সকল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী হয় সেই সকল চ্যালেঞ্জকে আকল, ইদরাক (উপলব্ধি) এবং বাসিরাত (দূরদৃষ্টি) দিয়ে মূল্যায়ন করার পন্থা হল ‘ইবরেত’। ইবরেত হল, বস্তু (মেটারিয়াল) থেকে অর্থ (মিনিং) র দিকে, স্বপ্নের জগত থেকে হাকিকতের দুনিয়ায় পদার্পণ করার নাম। এক অর্থে, ডাইমেশন (মাত্রা) পরিবর্তন করা। ইবরেত (عبرة ) হল; মহাবিশ্ব নিয়ে এবং একই সাথে আল্লাহ তার এই সৃষ্টির উপর যে বিধান নির্ধারণ করে দিয়েছেন সেগুলো নীয় এবং সর্বোপরি সুন্নাহতুল্লাহ নিয়ে চিন্তা করা। কঠিন অভিজ্ঞতা সমূহকে আকল দিয়ে চিন্তা (তাফাক্কুর) করে দূরদৃষ্টি দিয়ে শিক্ষনীয় বিষয় সমূহ খুঁজে বের করা। ইবরেত (عبرة ) এর শাব্দিক কোন অর্থ নয়। ঘটনা সমূহের কারণ এবং ফলাফলের উপরে দূরদৃষ্টি দেওয়া, গভীর ভাবে চিন্তা করা এবং দেখান থেকে শিক্ষা খুঁজে বের করা। মূলত ইবরেত (عبرة ), শব্দবিহীন এবং উচ্চারণবিহীন ইলাহী একটি ওয়াজ। আমাদের অন্তরের আবেগ, অনুভূতি এবং চিন্তার গোপন একটি বহিঃপ্রকাশ হওয়ার কারণে, আরবীতে চোখের পানির অপর নাম হল ইবরেত (عبرة )। অনেক আয়াতে ঐতিহাসিক ঘটনাবলী সমূহ, ঐতিহাসিক কাহিনী সমূহ আমাদের উদ্দেশ্য বিবৃত করার পর কোরআনে কারীম বলে থাকে যে, 
إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَعِبْرَةً لِّأُولِي الْأَبْصَارِ﴾)
অর্থঃ এখানে বাসিরেত (দূরদৃষ্টি) সম্পন্ন লোকদের জন্য ইবরেত (শিক্ষা) রয়েছে। (সূরা নূর-৪৪)

অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছে, 
فَاعْتَبِرُوا يَٓا اُو۬لِي الْاَبْصَارِ 
অর্থঃ শিক্ষা (ইবরেত) গ্রহণ করো হে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন লোকেরা। (সূরা হাশর- ৫৯)

তাফাক্কুর (গভীর চিন্তা) এবং বাসিরেত (দূরদৃষ্টি) ছাড়া ইবরেত (শিক্ষা) গ্রহণ করা সম্ভব নয়। 

প্রিয় ভাইয়েরা, 
বিশ্ব মানবতা হিসেবে আমরা এমন এক সময় অতিক্রম করছি যেই সময়ে আমরা অনেক বড় বড় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। আমাদের নিজেদেরকে নিয়ে, আমাদের নফসকে নিয়ে, সৃষ্টিকে নিয়ে, সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে নিয়ে, সৃষ্টির হিকমতকে নিয়ে, দুনিয়া এবং সমগ্র মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার সময়। সবচেয়ে বড় শিক্ষা (ইবরেত) এটাই। আজকে আমরা যে অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি সেই অবস্থাকে যদি শুধুমাত্র চীনে প্রকাশিত হওয়া এবং পরবর্তীতে সমগ্র দুনিয়াকে গ্রাসকারী একটি মহামারী রোগ হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে সঠিক শিক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে না। 

আমরা যদি এই অবস্থাকে ইবরেত এর সঠিক অর্থের আলোকে পাঠ করি তাহলে এই অবস্থা আমাদেরকে এবং সমগ্র মানবতাকে চিৎকার করে বলেছেঃ 

হে মানব জাতি! এই দুনিয়ার প্রতি ও প্রকৃতির প্রতি মালিকের মত আচরণ করো না। এই দুনিয়ার প্রতি ও প্রকৃতির প্রতি মালিকের মত আচরণ করা থেকে এবং এই দুনিয়াএ যথেচ্ছা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাক। তোমরা প্রকৃতিকে ধ্বংস করার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছ সেখান থেকে বিরত থাক। পৃথিবীকে বিনির্মাণ করার জন্য প্রতিযোগিতা করুন। মহান আল্লাহ কি তার মহাগ্রন্থে বলেন নি; 
هُوَ اَنْشَاَكُمْ مِنَ الْاَرْضِ وَاسْتَعْمَرَكُمْ ف۪يهَا 
অর্থঃ তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যেন এই পৃথিবীকে বিনির্মাণ করো এটা তিনি চান। (হুদ-৬১) আসুন পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকুন। ইসলাহর নামে এই দুনিয়াকে ধ্বংস করবেন না। এই মহাবিশ্ব সকল নিয়ামত সমূহ আপনাদের নিকট আমানত। দয়া করে এই আমানতের খিয়ানত করবেন না। আমরা যে সময় অতিক্রম করছি এই সময় আমাদেরকে চিৎকার করে এই আহবান জানাচ্ছে। আপনারা একই মাটির একই পানির সন্তান। একই বাতাস থেকে আপনারা নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। আল্লাহ আপনাদেরকে যে নিয়ামত দিয়েছেন সেই নিয়ামত গুনে শেষ করতে পারবেন না। কোন কিছুর পরওয়া না করে এই বাতাসকে যেভাবে দূষিত করছেন এখান থেকে বিরত থাকুন। হে মানুষগণ, মাটিকে ধ্বংস করো না! হে মানুষগণ পানিকে দূষিত করো না। হে মানুষগণ হালাল ও পবিত্র জিনিশ ভক্ষন করো। হে মানুষগণ নিকৃষ্ট ও খারাপ বিষয় সমূহ থেকে দূরে থাকুন। হে মানুষগণ এই প্রকৃতি হল মুসলিম। তারা আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করেছে। 
وَلَهُٓ اَسْلَمَ مَنْ فِي السَّمٰوَاتِ وَالْاَرْضِ , 
অর্থঃ আকাশে ও জমিনে যা কিছু আছে সকল কিছুই আল্লাহর নিকট সমর্পণ করেছে। (আলে ইমরান-৮৩)
এই জন্য প্রকৃতির ধারা ও বিন্যাসকে নষ্ট করবেন না, তাদের আত্মসমর্পণে হস্তক্ষেপ করবেন না। 

হে মানব জাতি, আল্লাহ যে মানব জাতিকে সম্মানিত করেছেন সেই মানুষদেরকে সম্মান করুন, তাদেরকে মূল্যায়ন করুন। তবে সাবধান আল্লাহর চেয়ে মানুষকে বেশী মূল্য দিবেন না। সৃষ্টিকর্তা মৃত্যুবরণ করেছে (নাউযুবিল্লাহ) এই ধরণের বানোয়াট দার্শনিক চিন্তা থেকে দূরে থাকুন। আপনাদের দুর্বলতার কথা ভুলে যানে না। নিজেদের দুর্বলতাকে ঢেকে রাখার জন্য যে অহংকারের পোশাক পরিধান করেছ এই পোশাককে খুলে ফেলুন। হে মানুষ সকল! সকল কিছুকে বস্তুবাদী চোখে দেখা থেকে ফিরে আসুন। মানুষকে শুধুমাত্র শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করবেন না। রূহের সাথে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকুন। এই বস্তু জগত ছাড়াও যে মেটাফিজিক্যাল এবং আধ্যাত্মিক একটি জগত রয়েছে সেটাকে ভুলে যাবেন না। মহাকাশ নিয়ে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করা বন্ধ করুন, এই লক্ষ্যে মানুষকে যে গোলামী জিঞ্জিরে আবদ্ধ করছেন সেখান থেকে ফিরে আসুন। 
হে মানব জাতি! জ্ঞানের পেছনে ছুটে চলো। জ্ঞান থেকে বিরত থাকবেন না। জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নতুন আবিষ্কার অব্যাহত রাখুন। কিন্তু জ্ঞানকে শুধুমাত্র আকলের সাথে সম্পৃক্ত বিষয় বলে মনে করবেন না। বিজ্ঞানকে প্রবিত্র একটি ডগমায় রূপান্তর করবেন না। বিজ্ঞানকে মানুষ এবং প্রকৃতির বিরুদ্ধে ব্যবহার করবেন না। রাসায়নিক অস্রের প্রস্তুতি ও ব্যবহার থেকে ফিরে আসুন। 
হে মানুষগণ! রাজনীতিকে অহংকার এবং আত্মম্ভরিতা, শক্তি ও ক্ষমতার নেশায় সাম্রাজ্য পাওয়ার জন্য ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। বরং রাজনীতিকে; আখলাক, আদালত এবং রহমতের মাধ্যমে মানুষকে সেবার মাধ্যমে রূপান্তরিত করুন। সুন্দর একটি দুনিয়া প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতি করুন। বিশ্বায়নের নামে সমগ্র দুনিয়াকে শাসন করার আকাঙ্ক্ষা থেকে বিরত থাকুন। 

আমরা আজ যে সময় অতিক্রম করছি এই সময় আজ আমাদেরকে এই সকল কথাই বলছে। 

হে মানব জাতি! এই দুনিয়াকে সব সময় পূর্ব ও পশ্চিম দিয়ে ভাগ করবে না। পূর্বও আল্লাহর পশ্চিমও আল্লাহর। 

لِلّٰهِ الْمَشْرِقُ وَالْمَغْرِبُۜ, 
অর্থঃ পূর্ব ও পশ্চিম সবই আল্লাহর ৷

رَبُّ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ
অর্থঃ আল্লাহ পূর্বেরও রব, পশ্চিমেরও রব। 

হে প্রাচ্য, সব সময় পশ্চিমকে অভিশাপ না দিয়ে পাশ্চাত্যের আকাশে উদিত সূর্য হও। হে পাশ্চাত্য, প্রাচ্যকে সবসময় ছোট না ভেবে প্রাচ্যের আকাশে উদিত হওয়া সূর্য থেকে উপকৃত হও। 
বর্তমান অবস্থা আমাদেরকে আরও একটি বার্তা দিচ্ছে সেটা হল, দুনিয়াকে মূল্য দাও। কিন্তু মানব জীবন যে শুধুমাত্র দুনিয়ার জীবনের সাথেই সম্পৃক্ত নয় এর উপরে ঈমান আন। চিরস্থায়ী বিষয়কে অস্থায়ী একটি জিনিসের বিনিময়ে উৎসর্গ করো না। আমাদের এই দুনিয়ার জীবন, চিরন্তন ও চিরস্থায়ী জীবনের প্রথম দরজা মাত্র। আমরা যেন ভুলে না যাই যে, দুনিয়ার জীবন চিরন্তন জীবনের প্রথম প্রহর। জান্নাতের বীজ আমরা এই দুনিয়া নামক বাগানেই বপন করি। জাহান্নামের আগুনকেও আমরা এই দুনিয়া নামক জায়গা থেকেই নিয়ে যাব। 
وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُۚ 
অর্থঃ যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। (সূরা আল বাকারা-২৪)

প্রিয় ভাইয়েরা, 
আজকে আমরা যে সময় অতিক্রম করছি এই সময়টি আমাদের মুসলমানদেরকেও ‘ইবরেত’ এর ভাষায় অনেক কিছু বলছে। অনেক কিছু, অনেক কিছু বলছে। মুসলমানদের প্রাচীন ভূমি সমূহ, সভ্যতার প্রানকেন্দ্রসমূহকে ধ্বংস স্তুপে পরিণতকারী যুদ্ধ সমূহ থেকে কি এখনো বিরত হবেন না? আল্লাহর দ্বীনকে সঠিক ভাবে বুঝুন। নিজদেরকে ধারণার উপর ভিত্তি করে দ্বীনের নামে যে ভুল চিন্তাধারার সৃষ্টি করেছেন সেগুলোকে পরিত্যাগ করুন। আখেরাতের চিরন্তনতা ও চিরস্থায়ীত্বতা বুঝাতে গিয়ে যে দুনিয়াকে আপনাকে বিনির্মাণ করার কথা বলা হয়েছে সেই দুনিয়াকে অচ্ছুৎ ও নিচু করে দেখানো দেখে বিরত থাকুন। যারা মানুষকে আল্লাহর বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেয়, মানুষকে আল্লাহর উপর স্থান দেয় আমরা অবশ্যই সেই চিন্তার বিরোধিতা করব, তাদের সমালোচনা করব। কিন্তু এটা করার জন্য যেন আমরা মানুষকে নিচু না বানিয়ে দেই, ইনসানী ও ইসলামী বিষয়কে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে না দেই। যে আইডিয়োলজি বিজ্ঞানকে ডগমায় পরিণত করে সেই আইডিওলজি সমূহকে আমরা অবশ্যই সমালোচনা করব। এই সমালোচনা করার সময় আল্লাহ তার সৃষ্টি জগতে যে আইন কানুন নির্ধারণ করেছেন সেই সকল আইন কানুনের তাফসীর বিজ্ঞানকে পরিত্যাগ করা থেকে দূরে থাকতে হবে এবং আমাদের মানব কল্যাণের জন্য বিজ্ঞান সৃষ্টি করতে হবে। আসুন এই বার আমরা সমগ্র মানব জাতিকে এই মহামারী থেকে উদ্ধার করি। ওষধ, টিকা এবং শিফা আমরা এবার খুঁজে বের করি। ওষধ আবিষ্কার করে আমরা এই সওয়াবের ভাগি হই। আমাদের মহাগ্রন্থ আল কোরআন কি একজন মানুষের জীবন বাঁচানোকে সমগ্র মানবতার জীবন বাঁচানো সমান হিসেবে দেখে না? 
وَمَنْ اَحْيَاهَا فَكَاَنَّمَٓا اَحْيَا النَّاسَ جَم۪يعاًۜ
অর্থঃ আর যে ব্যক্তি কারো জীবন রক্ষা করলো সে যেন দুনিয়ার সমস্ত মানুষের জীবন রক্ষা করলো ৷ (মায়েদা-৩২) 
এই বার সমগ্র মানবতাকে বাঁচানোর জন্য একজন মুসলমান এগিয়ে আসুক। নাকি একই ভাবে আগের মত অন্যকেউ যখন এর ওষুধ খুঁজে বের করবে তখন আমরা তার আখেরাতের অবস্থা কি হবে সেটা নিয়ে বিতর্ক শুরু করব? আমাদের কাজ কি শুধু এটাই? যে সমগ্র মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য একটি ওষুধ বা টিকা আবিষ্কার করল আখেরাতে তার অবস্থা কি হবে সেটা নিয়ে ফতওয়া দেওয়া? 

প্রিয় ভাইয়েরা,
এই অবস্থা আমাদেরকে সমগ্র মানবতাকে নিয়ে নতুন একটি রহমতের চুক্তি করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। সমগ্র মানবতা যেই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হবে, কেও এই চুক্তির বাহিরে থাকবে না। হ্যাঁ, একটি রহমতের চুক্তির মাধ্যমে আমাদের নতুন একটি জীবন শুরু করা দরকার। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন এর ওসিলায় আমাদেরকে মহামারি থেকে উদ্ধার করেন। আমাদেরকে যেন এই কঠিন পরিক্ষা থেকে মুক্তি দেন। যে ভাইরাস ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপ ছাড়া দেখা যায় না, সেই ভাইরাস সমগ্র মানবতাকে কত বড় শিক্ষাই না দিচ্ছে। যার স্বাক্ষি আমরা সকলেই। মহান আল্লাহ যেন মাহে রমজানের ওসিলায় আমাদেরকে এই মহাবিপদ থেকে মুক্তি দান করেন। আমীন।। 

অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।